
আজকাল প্রায় সবার হাতেই একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে। নতুন ফোন কেনার পর প্রথম কয়েক মাস সবকিছু দুর্দান্ত চলে। অ্যাপ খোলে মুহূর্তেই। গেম খেলতে কোনো ঝামেলা নাই। ছবি তুললে সাথে সাথে সেভ হয়। স্ক্রল করলে মনে হয় মাখনের উপর দিয়ে হাত চলছে। কিন্তু ছয় মাস বা এক বছর পার হলে শুরু হয় সমস্যা। ফোন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যায়। অ্যাপ খুলতে সময় লাগে। গেম খেললে ফ্রেম ড্রপ করে। চার্জও দ্রুত শেষ হয়। কখনো কখনো ফোন গরম হয়ে যায় শুধু ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়েও।
অনেকে তখন ভাবেন ফোনটা বুঝি পুরনো হয়ে গেছে। নতুন ফোন কেনার ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। দোকানে গিয়ে নতুন মডেল দেখেন। দাম শুনে মন খারাপ হয়। কিন্তু সত্যি কথা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফোনের প্রসেসর ঠিকই থাকে। সমস্যাটা হয় সেটিংসে। কিছু ডিফল্ট সেটিংস আছে যেগুলো ব্যাটারি বাঁচানোর জন্য প্রসেসরের গতি কমিয়ে দেয়। আবার কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে যেগুলো প্রসেসরের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। ফলে যে অ্যাপটা আপনি এখন খুলতে চাইছেন সেটাকে প্রসেসরের কাছে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়।
আজ এমন পাঁচটা সেটিংস নিয়ে কথা বলব যেগুলো ঠিক করলে আপনার পুরনো ফোনও নতুনের মতো দ্রুত হয়ে উঠতে পারে। এগুলোর জন্য রুট করা লাগবে না। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করতে হবে না। ফোনের ওয়ারেন্টিও থাকবে। শুধু ফোনের সেটিংসে ঢুকে কয়েকটা জিনিস বদলালেই হবে।
১ ডেভেলপার অপশনে গিয়ে অ্যানিমেশন স্কেল কমানো
এটা সম্ভবত সবচেয়ে কম পরিচিত কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী ট্রিক। আপনার ফোনের সেটিংসে একটা লুকানো মেনু আছে যার নাম ডেভেলপার অপশনস। সাধারণত এটা লুকানো থাকে। কারণ এই মেনুতে এমন কিছু অপশন আছে যেগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য নয়। ভুল কিছু বদলে ফেললে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু আমরা শুধু অ্যানিমেশনের তিনটা অপশন বদলাব যা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
চালু করতে প্রথমে যান About Phone সেকশনে। তারপর Build Number খুঁজুন। এটা অনেক ফোনে Software Information এর ভিতরে থাকে। সেখানে টানা সাতবার ট্যাপ করুন। ফোন একটা মেসেজ টিপে যে আপনি এখন ডেভেলপার হয়েছেন। কিছু ফোনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা পিন চাইতে পারে। দিলেই হয়ে যাবে।
এরপর সেটিংসে ফিরে গিয়ে Developer Options খুঁজুন। ফোনের ব্র্যান্ড অনুযায়ী এটা সিস্টেম সেকশনে বা সেটিংসের একদম নিচে থাকতে পারে। ভেতরে ঢুকলে নিচের দিকে তিনটা অপশন পাবেন। Window Animation Scale। Transition Animation Scale। Animator Duration Scale। এই তিনটাই সাধারণত ১x বা ১.৫x থাকে। এগুলো ০.৫x করে দিন। কিছু ফোনে ০.৫x না থাকলে অফ করে দিন।
এর ফলে কী হবে। অ্যাপ খোলার সময় যে সুন্দর অ্যানিমেশন দেখতে পান সেটা দ্রুত হয়ে যাবে। আসলে ফোন বেশি ফাস্ট হয়নি। কিন্তু অ্যানিমেশন কম সময় নেওয়ায় আপনার মনে হবে ফোন অনেক দ্রুত চলছে। এটা ছোট একটা পরিবর্তন কিন্তু পার্থক্যটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
আর একটা কথা। এই অপশনগুলো যদি আপনার পছন্দ না হয় আবার ১x করে দিলেই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাই কোনো ঝুঁকি নেই। চিন্তা ছাড়া করে দেখতে পারেন।
২ ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস লিমিট করা
আপনার ফোনে অনেক অ্যাপ আছে যেগুলো আপনি খুলেননি কখনো কিন্তু তারপরও ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে। ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম মেসেঞ্জার ইউটিউব এসব অ্যাপ নোটিফিকেশন আনার জন্য সারাক্ষণ সক্রিয় থাকে। আপনি ঘুমালেও তারা জেগে থাকে। এতে প্রসেসর সব সময় ব্যস্ত থাকে। র্যাম ভরে যায়। ফলে যে অ্যাপটা আপনি এখন খুলতে চাইছেন সেটা খুলতে দেরি হয়। কখনো কখনো অ্যাপ ক্র্যাশও করে।ডেভেলপার অপশনেই আরেকটা অপশন আছে যার নাম Background Process Limit। এটা ডিফল্টভাবে Standard থাকে। এর মানে হলো ফোন নিজেই ঠিক করে কতটা অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলবে। কিন্তু ফোন সব সময় বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নেয় না। তাই আমরা নিজেই এটা নিয়ন্ত্রণ করবো।
ওখানে গিয়ে Maximum ২ প্রসেস বা Maximum ৩ প্রসেস সিলেক্ট করে দিন। এর ফলে ফোন একসাথে অনেক অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চালাতে পারবে না। ফলে প্রসেসরের ওপর চাপ কমবে। র্যাম খালি থাকবে। যে অ্যাপটা আপনি সামনে ব্যবহার করছেন সেটা বেশি রিসোর্স পাবে।
তবে একটা কথা মনে রাখবেন। এভাবে লিমিট করলে কখনো কখনো মেসেজ বা নোটিফিকেশন দেরিতে আসতে পারে। কারণ অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে না পারলে নোটিফিকেশন পাঠাতে দেরি হয়। তাই যদি আপনি গুরুত্বপূর্ণ নোটিফিকেশন মিস করতে না চান তাহলে Maximum ৩ বা Maximum ৪ রেখে দিন। খুব বেশি কমিয়ে দিলে ফোন ফাস্ট হবে কিন্তু নোটিফিকেশনে সমস্যা হতে পারে।
আর যদি দেখেন ফোন খুব বেশি গরম হচ্ছে তাহলে Maximum ১ বা Maximum ২ দিয়ে দেখুন। ফোন ঠান্ডা থাকবে। ব্যাটারিও ভালো যাবে।
৩ অটো স্টার্ট অ্যাপ বন্ধ করা
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে একটা বড় সমস্যা হলো অনেক অ্যাপ নিজে থেকেই চালু হয়ে যায়। আপনি ফোন রিস্টার্ট করলেন দেখবেন ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম শপিং অ্যাপ সব চালু হয়ে গেছে। এগুলো নিজেরাই ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে। র্যাম খায়। আর প্রসেসরকে ব্যস্ত রাখে। ফলে ফোন স্লো হয়ে যায়। ব্যাটারিও দ্রুত শেষ হয়।
বেশিরভাগ ফোনে এখন অটো স্টার্ট ম্যানেজার নামে একটা অপশন থাকে। সেটিংসে গিয়ে Apps সেকশনে ঢুকেন। তারপর Auto Start বা Autostart Manager খুঁজুন। কিছু ফোনে এটা Permission Manager বা Special Access এর ভেতরে থাকে। এখানে আপনি দেখতে পাবেন কোন কোন অ্যাপ নিজে থেকে চালু হওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
যে সব অ্যাপ আপনার খুব দরকার নেই সেগুলোর অটো স্টার্ট বন্ধ করে দিন। যেমন ধরুন একটা শপিং অ্যাপ। আপনি দিনে একবার খোলেন। কিন্তু সেটা সারাদিন ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে। এটার অটো স্টার্ট বন্ধ করলে প্রসেসরের অনেকটা চাপ কমবে। একইভাবে কম ব্যবহারের অ্যাপগুলোর ব্যাপারেও একই কাজ করুন।
তবে কিছু অ্যাপ রাখতে হবে। যেমন হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জার বা আপনার ব্যাংকিং অ্যাপ। এগুলো বন্ধ করলে মেসেজ বা লেনদেনের নোটিফিকেশন পাবেন না। তাই এগুলো চালু রাখেন। বাকিগুলো বন্ধ করে দেন।
মনে রাখবেন অটো স্টার্ট বন্ধ করলে ফোন শুধু ফাস্ট হবে না ব্যাটারিও অনেক ভালো যাবে। কারণ অ্যাপগুলো আর ব্যাকগ্রাউন্ডে জেগে থাকবে না।
৪ ডেটা সেভার আর ব্যাটারি সেভার সঠিকভাবে ব্যবহার করা
অনেকেই জানেন না যে ডেটা সেভার মোড শুধু ডেটা বাঁচায় না ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিটিও কমায়। এই মোড চালু করলে অ্যাপগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে ডেটা ব্যবহার করতে পারে না। ফলে তারা কম সক্রিয় থাকে। প্রসেসরের ওপর চাপ কমে। ইন্টারনেট স্লো হলেও ফোন ফাস্ট মনে হবে।
সেটিংসে গিয়ে Network and Internet সেকশনে ঢুকেন। তারপর Data Saver খুঁজেন। এটা চালু করে দেন। তবে কিছু অ্যাপের জন্য ব্যতিক্রম রাখতে পারেন। যেমন হোয়াটসঅ্যাপ বা আপনার গুরুত্বপূর্ণ মেসেজিং অ্যাপ। সেগুলোতে গিয়ে Unrestricted Data Access দিয়ে দেন। না হলে মেসেজ আসতে দেরি হবে।
একইভাবে Battery Saver মোডও কাজে দায়। এটা চালু করলে ফোন ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিটি কমায়। কিছু ফোনে প্রসেসরের গতি সামান্য কমিয়ে দায়। তাই এখানে একটা সতর্কতা আছে। যদি আপনি ফোনের পারফরম্যান্স চান তাহলে ব্যাটারি সেভার সবসময় চালু রাখবেন না। শুধু দরকারের সময় চালু করবেন। যেমন রাতে ঘুমানোর আগে বা যখন চার্জ কম।
কিছু ফোনে Adaptive Battery নামে একটা অপশন থাকে। এটা আপনার ব্যবহার দেখে অ্যাপগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটাও চালু রাখতে পারেন। এতে অ্যাপগুলো কম ব্যাকগ্রাউন্ডে চলবে। ফোন ফাস্ট থাকবে।
৫ ক্যাশে আর অপ্রয়োজনীয় ফাইল পরিষ্কার রাখা
এটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও আসলে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। আপনার ফোনে যত অ্যাপ ততো ক্যাশ। প্রতিদিন ব্যবহারের ফলে ক্যাশ জমতে থাকে। কিছু অ্যাপের ক্যাশে কয়েকশো মেগাবাইট ছাড়িয়ে যায়। এতে স্টোরেজ ভরে যায়। আর স্টোরেজ ভরে গেলে ফোন স্লো হয়ে যায়। এটা অনেকেই জানেন না।
সেটিংসে গিয়ে Storage সেকশনে ঢুকুন। তারপর Cached Data খুঁজুন। এখানে ক্লিক করলে ফোন দেখাবে কতটা জায়গা ক্যাশে দখল করেছে। ক্লিয়ার করে দিন। এটা নিরাপদ। এতে আপনার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য মুছে যাবে না। শুধু অস্থায়ী ফাইল মুছে যাবে।
এছাড়া বড় বড় অ্যাপের ভেতরেও আলাদা করে ক্যাশ ক্লিয়ার করা যায়। যেমন ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম ইউটিউব। অ্যাপের সেটিংসে গিয়ে Clear Cache অপশন পাবেন। মাসে একবার এটা করলেই ভালো।
আর একটা কাজ করতে পারেন। আপনার ফোনে যদি অনেক দিন ধরে ব্যবহার না করা অ্যাপ থাকে সেগুলো আনইনস্টল করে দিন। কারণ এসব অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে। জায়গা খায়। প্রসেসরের ওপর চাপ ফেলে। যেগুলো মাসে একবারও ব্যবহার করেন না সেগুলো রাখার কোনো মানে নাই।
এছাড়া ডাউনলোড ফোল্ডার পরিষ্কার করেন। হোয়াটসঅ্যাপের মিডিয়া ফাইল চেক করেন। এসব জায়গায় অনেক অপ্রয়োজনীয় ফাইল জমে থাকে। এসব মুছে দিলে ফোনের স্টোরেজ খালি হবে। ফোন ফাস্ট হবে।
শেষ কথা
এই পাঁচটা সেটিংস ঠিক করলে আপনার ফোনের প্রসেসর আসলে নতুন হয়ে যাবে না। কিন্তু এটা সত্যি যে ফোন অনেকটা দ্রুত অনুভব হবে। কারণ প্রসেসরের ওপর যে বাড়তি চাপ ছিল সেটা কমে যাবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অপ্রয়োজনীয় কাজ কমবে। ফলে যে কাজটা করছেন সেটা পাবে পুরো শক্তি।
তবে একটা কথা মনে রাখা জরুরি। ফোনের গতি শুধু সেটিংসের ওপর নির্ভর করে না। স্টোরেজ প্রায় ভরে গেলে ফোন ধীর হবে। খুব বেশি ভারি অ্যাপ ইনস্টল থাকলে ফোন ধীর হবে। পুরনো অ্যান্ড্রয়েড ভার্সন হলে নতুন অ্যাপ ভালোভাবে চলবে না। তাই এই সেটিংসগুলোর পাশাপাশি ফোনের স্টোরেজ খালি রাখেন। দরকার নাই এমন অ্যাপ আনইনস্টল করুন। আর সময়ে সময়ে ফোন আপডেট রাখুন।
আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ফোনের প্রতি একটু যত্ন নিলে সেটা অনেক দিন ভালোভাবে চলবে। নতুন ফোন কেনার আগে এই পাঁচটা জিনিস একবার ঠিক করে দেখুন। হয়তো দেখবেন আপনার পুরনো ফোনটাই যথেষ্ট।
